একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো - একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশসাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকেসন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো - কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকেযৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে - তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারেএকটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবেChild Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ - বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্বশিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম - সবারই ভূমিকা রয়েছে।স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধএকটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় - সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকারশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় - “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে - “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ - তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।লেখক: ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
৬ দিন আগে
নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এগুলো জাতীয় সীমান্তে থেমে যায় না, ধনী-দরিদ্র দেশের মধ্যে পার্থক্য করে না, আর কোনো দেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখে বলে তাকে রেহাইও দেয় না। জলবায়ু পরিবর্তন একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সংকট হলেও এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সেই দেশগুলোতেই, যারা এই সমস্যার জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।নেপাল এই বৈষম্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে ০.১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে, অথচ দেশটি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, কীভাবে চরম আবহাওয়া দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে - ধ্বংস করতে পারে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা।নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে এই ট্র্যাজেডি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার আবাসস্থল নেপাল হিমালয় অঞ্চলের অংশ, যাকে বিপুল বরফ-মজুদের কারণে কখনও কখনও "তৃতীয় মেরু" (Third Pole) বলা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে - যা পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও হিমালয়-নির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করছে।হিমবাহ দ্রুত গলে পানির প্রবাহ বেড়ে গিয়ে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্টি হতে পারে, যা অস্থিতিশীল হয়ে হঠাৎ নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে হিমবাহের অব্যাহত ক্ষয় দীর্ঘমেয়াদে পানির প্রাপ্যতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। ফলে উঁচু পাহাড়ে যা ঘটছে, তা বহুদূরের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও প্রাণহানির চিত্র এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, উদ্ধারকারীরা বিপজ্জনক বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। এদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত মর্মান্তিক ঘটনা - পরিবার বিচ্ছিন্ন, ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া, জনপদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। এই দুর্যোগ শুধু সম্পদ নয়, কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাবোধও।চেন্নাই ভিত্তিক গণমাধ্যম The Hindu -এর প্রতিবেদন অনুযায়ী; ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৩৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৫,০০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আজ পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ১৩,০০০ জনকে উদ্ধার করেছে। এগুলো নিছক শুধু পরিসংখ্যান নয় - এগুলো এমন মানুষের জীবন, যারা সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২২,০০০ শিশু নিরাপদ পানিহীন, তীব্র খাদ্য ও অক্সিজেন সংকটে রয়েছে – যা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের মৌলিক অবিচার: যারা এই সংকটে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারা প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়। দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় অংশের জন্য দায়ী। UNEP Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির জোট (G20 Countries) ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো - যারা বৈশ্বিক নিঃসরণে সামান্য অবদান রেখেছে - জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। এই বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: যে সংকটের জন্য গুটি কয়েকটি দেশ বহুলাংশে দায়ী তার জন্য সবাই সমানভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হতে পারে না। তাই এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার খরচ কে বহন করবে?জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়। সম্প্রতি, নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যা সেখানকার জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের উন্নয়ন-অর্জন কয়েক ঘণ্টায় ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ঘটনায় মাত্র কয়েক মুহুর্তের মধ্যে নেপালের বিধ্বংস্থ অঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যায়।দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারের জন্য একটি ঘর বা জীবিকা হারানোর অর্থ হতে পারে বছরের পর বছরের দুর্ভোগ। এর প্রভাব দুর্যোগ-এলাকাতেও সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর পুনর্নির্মাণের ব্যয় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।এ কারণেই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। দেশে-দেশে এর ব্যাপ্তি ও প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বায়ুমণ্ডল রাজনৈতিক সীমান্ত মেনে চলে না; একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে মিশে সর্বত্র উষ্ণতা বাড়ায় যার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলকে সহায়তা করারও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। এখানেই রয়েছে জলবায়ূ ন্যায়্যতা।নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ - শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রয়োজন। তবে শুধু অভিযোজন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে অভিযোজনেরও সীমা রয়েছে। তাই বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে মূল কারণ, অর্থাৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো ও বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।নেপালের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তান ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ পরস্পর-সংযুক্ত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি - বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ। হিমালয়ে যা ঘটে তা নিম্নাঞ্চলের নদীব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে; এক দেশে যা ঘটে তা অন্য দেশের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সহবস্থান ও যৌথ সমাধান; যেমন: দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও নদী ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, এবং জাতিসংঘ ও বিধিবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সরাসরি আর্থিক ও অর্থবহ কারিগরি সহায়তা নিশ্চিতকরণ।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জলবায়ু মোকাবিলার কার্যক্রম শুধু বক্তৃতা ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বন্যা ও বিলীন হয়ে যাওয়া হিমবাহের মুখোমুখি মানুষদের প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ - নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকা, সহজলভ্য অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সংহতি।বন্যার কবল থেকে মানুষ তুলে আনার দৃশ্য কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয় - এটি বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে মানুষ, যাদের জীবন ও জীবিকা কোনো না কোনোভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের কার্বন নিঃসরণ সামান্য হলেও তার ঝুঁকিপ্রবণতা হতে পারে বিপুল। বিপরীতভাবে, বেশি কার্বন নিঃসরণকারী জি২০ দেশগুলোর উচিৎ ভুক্তভোগী দেশগুলোকে সহায়তা করা; যাতে জলবায়ূ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি অসম। নেপালের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু আমাদের গ্রহকে সংযুক্ত রাখা বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, নদী ও আবহাওয়াব্যবস্থা থেকে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। তেমনি এগুলো প্রতিরোধ, মোকাবিলা ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষিত করার দায়িত্বেরও কোনো সীমান্ত থাকা উচিত নয়। সম্মিলিতভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে।এখন সময় এসেছে বিশ্বের উপলব্ধি করার যে, জলবায়ু ন্যায্যতা কোনো দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তাহলে জলবায়ু মোকাবিলার পদক্ষেপ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সংহতিকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।নেপালের বন্যাকে একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে দেখা উচিত সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে: পরিবর্তিত জলবায়ু থেকে কোনো দেশ একা রক্ষা পেতে পারে না, এবং এর পরিণতি মোকাবিলায় কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com
১ মাস আগে