শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ?


একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো - একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশসাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয়শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকেসন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো - কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয়নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকেযৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে - তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারেএকটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবেChild Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ - বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্বশিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম - সবারই ভূমিকা রয়েছে।স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধএকটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় - সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকারশিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় - “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে - “কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?”আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ - তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।লেখক: ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।

৬ দিন আগে

বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার

বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার


বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এই সম্মানজনক পদে প্রত্যাবর্তন করল। গত ২ জুনের নির্বাচনে ৯৯টি ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী অ্যান্ড্রেয়াস এস. কাকুরিসকে পরাজিত করে ড. রহমান সভাপতির পদটি নিশ্চিত করেন। জেনেভা ও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক সম্পূর্ণ অধিবেশনজুড়ে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।এছাড়া, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ সভায়ও ড. রহমান সভাপতিত্ব করবেন, যা জাতিসংঘের বার্ষিক সূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একজন সভাপতি নির্বাচিত হন।প্রতিবার নতুন সভাপতি একটি ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আসেন। এই কর্মসূচিকে আলাদা করে তোলা মূল বিষয়বস্তু নয়; কারণ - শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বহুপাক্ষিকতার সংস্কার; এগুলো জাতিসংঘের পরিচিত শব্দভাণ্ডার। এই অধিবেশনের প্রকৃত প্রশ্ন এই নয় যে, ড. রহমান কী-কী অগ্রাধিকার দিতে চান, বরং প্রশ্নটি হলো - সাধারণ পরিষদ একটি বিশ্ব মঞ্চ বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আদৌ কোন ক্ষমতা রাখে কিনা? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতির ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো আগামী বারো মাসে কাঠামোগতভাবে অর্জনযোগ্য হবে কিনা তা নির্ভর করবে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, বৈশ্বিক চাহিদা ও আচরণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রবলয়ের ভূমিকা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ধরণ ও আন্তরিকতার উপর। মূল সংকট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম অভূতপূর্ব বিশ্ব অস্থিরতাবিশ্ব আজ তার যৌথ ইতিহাসের আরেকটি সংকটময় অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সশস্ত্র সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মানবিক সংকট, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস এমন সব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে যা কোনো দেশের পক্ষেই একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এমন একটি নির্ধারণী মুহূর্তে, জাতিসংঘ আজও এমন একটি অন্যতম বিশ্বমঞ্চ যেখানে দেশগুলো একত্র হয়ে আলোচনা করতে এবং যৌথ সমাধান খুঁজতে পারে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। প্রধান আলোচনাকারী, নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ হিসেবে সাধারণ পরিষদ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, যেখানে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি জাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গ যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণ করে। এর দায়িত্বের পরিধি শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, মানবিক বিষয়াবলি, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং জাতিসংঘের বাজেট পর্যন্ত বিস্তৃত।এই পটভূমিতে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ছয়টি মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন:১) শান্তি ও নিরাপত্তা; ২) টেকসই উন্নয়ন; ৩) জলবায়ু পদক্ষেপ; ৪) মানবাধিকার ও মানবিক বিষয়াবলি; ৫) প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI); ৬) বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনযদিও এই অগ্রাধিকারগুলো আমাদের সময়ের জরুরি প্রয়োজনীয়তাগুলোকে প্রতিফলিত করে, তবে মূল প্রশ্ন থেকেই যায়: সাধারণ পরিষদ কি এসব অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি বৈশ্বিক অস্থিরতা এই বাস্তবায়নকে থমকে দেবে? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করলে বাস্তবায়নের একটি পরিষ্কার পথরেখা পাওয়া যায়। ছয়টি অগ্রাধিকারের বিশ্লেষণ: অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে রূপান্তর:১. শান্তি ও নিরাপত্তা: সংকটের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোরশান্তি ও নিরাপত্তা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, অথচ নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারে প্রায়শই আন্তর্জাতিক ঐক্যমত অচল হয়ে পড়ে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে সংঘাত ঘটার পর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে আগাম সংঘাত প্রতিরোধ, দ্রুত মধ্যস্থতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সাধারণ পরিষদের সম-অধিকারের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে - যেখানে কোনো একক দেশের ভেটো ক্ষমতা নেই - জাতিসংঘ রাজনৈতিক সংলাপ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সংকট বড় আকারের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার আগেই শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।২. টেকসই উন্নয়ন: বাস্তবায়নের ঘাটতি পূরণঅর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অগ্রাধিকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে পরিণত করতে হলে জাতিসংঘকে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে সম্পদ প্রদানে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি বৈষম্য হ্রাস, বৈশ্বিক বাজারে সবার সমান প্রবেশাধিকার এবং কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিমাপের দাবি রাখে।৩. জলবায়ু পদক্ষেপ: দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণজলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়; চরম আবহাওয়া প্রতিনিয়ত বহু বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জলবায়ু লক্ষ্যকে পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হলে কেবল নামমাত্র অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে এসে বাধ্যতামূলক জবাবদিহিতা, 'ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি' (Loss and Damage) তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পদক্ষেপ একটি টিকে থাকার লড়াই। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সম্পদ হস্তান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদকে কাজ করতে হবে।৪. মানবাধিকার ও মানবিক সাড়াদান: মানুষকে প্রাধান্য প্রদানবৈশ্বিক সংঘাত প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, যা শরণার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। মানবাধিকার নীতিগুলোকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপান্তর করতে মানবিক সহায়তাকে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আন্তর্জাতিক আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় - কোনো দ্বিমুখী নীতি ছাড়াই - যাতে সংঘাত যেখানেই ঘটুক না কেন মানবিক সহায়তা ও তহবিল সুরক্ষিত থাকে।৫. প্রযুক্তি ও এআই শাসন: ডিজিটাল বৈষম্য প্রতিরোধকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে, তবে কয়েকটা ধনী দেশের হাতে প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ থাকলে তা বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে নতুন প্রযুক্তির জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এআই নীতি নির্ধারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে বৈশ্বিক বিভাজনের কারণ না বানিয়ে যৌথ অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।৬. বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন: সাফল্যের মূল নিয়ামকপূর্ববর্তী পাঁচটি অগ্রাধিকারের সফলতা সম্পূর্ণভাবে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার এবং ভাবমূর্তির ওপর নির্ভর করছে। যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অকার্যকর বা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে, তখন বহুপাক্ষিকতা ব্যর্থ হয়। এই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোরালো কণ্ঠস্বর প্রদান করা প্রয়োজন। আস্থা পুনর্গঠন কেবল কোনো প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল শর্ত।বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানোর উপায়৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের এই ছয়টি অগ্রাধিকার বর্তমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলার জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রদান করে। নিরাপত্তা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, উন্নয়ন জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায়, জলবায়ু স্থায়িত্ব মানবিক সংকট কমায় এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি এই সবগুলোকে গতিশীল করে।তবে কেবল ঘোষণাপত্র প্রকাশ বিশ্ব অস্থিরতা সমাধান করতে পারবে না। ৮১তম অধিবেশন তখনই এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিষদের গণতান্ত্রিক মঞ্চকে - যেখানে প্রতিটি দেশের সমান ভোট রয়েছে - রাজনৈতিক ঐক্যমত তৈরি, আর্থিক সম্পদ সংস্থান এবং যৌথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করবে।বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে রাজনৈতিক মানসিকতা এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিসংঘ এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে একটি স্থিতিশীল বিশ্বের জন্য বাস্তব সমাধানে রূপান্তর করতে পারে যদিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অতীত সাফল্য খুবই নগন্য।নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রিল্যান্স মিডিয়া কর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক।

১ মাস আগে

জলবায়ু দুর্যোগ: কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন নয়

জলবায়ু দুর্যোগ: কোনো দেশই বিচ্ছিন্ন নয়


নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এগুলো জাতীয় সীমান্তে থেমে যায় না, ধনী-দরিদ্র দেশের মধ্যে পার্থক্য করে না, আর কোনো দেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখে বলে তাকে রেহাইও দেয় না। জলবায়ু পরিবর্তন একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সংকট হলেও এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সেই দেশগুলোতেই, যারা এই সমস্যার জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।নেপাল এই বৈষম্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে ০.১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে, অথচ দেশটি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, কীভাবে চরম আবহাওয়া দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে - ধ্বংস করতে পারে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা।নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে এই ট্র্যাজেডি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার আবাসস্থল নেপাল হিমালয় অঞ্চলের অংশ, যাকে বিপুল বরফ-মজুদের কারণে কখনও কখনও "তৃতীয় মেরু" (Third Pole) বলা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে - যা পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও হিমালয়-নির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করছে।হিমবাহ দ্রুত গলে পানির প্রবাহ বেড়ে গিয়ে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ সৃষ্টি হতে পারে, যা অস্থিতিশীল হয়ে হঠাৎ নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে হিমবাহের অব্যাহত ক্ষয় দীর্ঘমেয়াদে পানির প্রাপ্যতাকেও হুমকির মুখে ফেলে। ফলে উঁচু পাহাড়ে যা ঘটছে, তা বহুদূরের মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও প্রাণহানির চিত্র এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, উদ্ধারকারীরা বিপজ্জনক বন্যার পানিতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করছেন। এদের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত মর্মান্তিক ঘটনা - পরিবার বিচ্ছিন্ন, ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া, জনপদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম। এই দুর্যোগ শুধু সম্পদ নয়, কেড়ে নিয়েছে মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তাবোধও।চেন্নাই ভিত্তিক গণমাধ্যম The Hindu -এর প্রতিবেদন অনুযায়ী; ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৩৪৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৫,০০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আজ পর্যন্ত দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ১৩,০০০ জনকে উদ্ধার করেছে। এগুলো নিছক শুধু পরিসংখ্যান নয় - এগুলো এমন মানুষের জীবন, যারা সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২২,০০০ শিশু নিরাপদ পানিহীন, তীব্র খাদ্য ও অক্সিজেন সংকটে রয়েছে – যা এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের মৌলিক অবিচার: যারা এই সংকটে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারা প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়। দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় অংশের জন্য দায়ী। UNEP Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী, বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির জোট (G20 Countries) ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো - যারা বৈশ্বিক নিঃসরণে সামান্য অবদান রেখেছে - জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। এই বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: যে সংকটের জন্য গুটি কয়েকটি দেশ বহুলাংশে দায়ী তার জন্য সবাই সমানভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হতে পারে না। তাই এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার খরচ কে বহন করবে?জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়। সম্প্রতি, নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ বন্যা সেখানকার জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের উন্নয়ন-অর্জন কয়েক ঘণ্টায় ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ঘটনায় মাত্র কয়েক মুহুর্তের মধ্যে নেপালের বিধ্বংস্থ অঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যায়।দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারের জন্য একটি ঘর বা জীবিকা হারানোর অর্থ হতে পারে বছরের পর বছরের দুর্ভোগ। এর প্রভাব দুর্যোগ-এলাকাতেও সীমাবদ্ধ থাকে না; পরিবহন, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর পুনর্নির্মাণের ব্যয় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জরুরি খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।এ কারণেই জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। দেশে-দেশে এর ব্যাপ্তি ও প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। বায়ুমণ্ডল রাজনৈতিক সীমান্ত মেনে চলে না; একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে মিশে সর্বত্র উষ্ণতা বাড়ায় যার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব সক্ষমতা অনুযায়ী নিঃসরণ কমানোর দায়িত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর দক্ষিণ এশিয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলকে সহায়তা করারও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। এখানেই রয়েছে জলবায়ূ ন্যায়্যতা।নেপালের মতো দেশগুলোর জন্য অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ - শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রয়োজন। তবে শুধু অভিযোজন দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে অভিযোজনেরও সীমা রয়েছে। তাই বিশ্বকে সম্মিলিতভাবে মূল কারণ, অর্থাৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো ও বন্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।নেপালের অভিজ্ঞতা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তান ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ পরস্পর-সংযুক্ত জলবায়ু ঝুঁকির মুখোমুখি - বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ। হিমালয়ে যা ঘটে তা নিম্নাঞ্চলের নদীব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে; এক দেশে যা ঘটে তা অন্য দেশের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি তৈরি করতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সহবস্থান ও যৌথ সমাধান; যেমন: দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও নদী ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা, এবং জাতিসংঘ ও বিধিবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সরাসরি আর্থিক ও অর্থবহ কারিগরি সহায়তা নিশ্চিতকরণ।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জলবায়ু মোকাবিলার কার্যক্রম শুধু বক্তৃতা ও ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বন্যা ও বিলীন হয়ে যাওয়া হিমবাহের মুখোমুখি মানুষদের প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ - নিরাপদ অবকাঠামো, নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা, সহনশীল জীবিকা, সহজলভ্য অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সংহতি।বন্যার কবল থেকে মানুষ তুলে আনার দৃশ্য কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয় - এটি বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নেপালে সংঘটিত ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে মানুষ, যাদের জীবন ও জীবিকা কোনো না কোনোভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।নেপালের অভিজ্ঞতা আমাদের জলবায়ু-দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কোনো দেশের কার্বন নিঃসরণ সামান্য হলেও তার ঝুঁকিপ্রবণতা হতে পারে বিপুল। বিপরীতভাবে, বেশি কার্বন নিঃসরণকারী জি২০ দেশগুলোর উচিৎ ভুক্তভোগী দেশগুলোকে সহায়তা করা; যাতে জলবায়ূ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি অসম। নেপালের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নেমে আসা এই বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ু সংকট থেকে নিরাপদ দূরত্ব বলে কিছু নেই। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু আমাদের গ্রহকে সংযুক্ত রাখা বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, নদী ও আবহাওয়াব্যবস্থা থেকে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। তেমনি এগুলো প্রতিরোধ, মোকাবিলা ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষিত করার দায়িত্বেরও কোনো সীমান্ত থাকা উচিত নয়। সম্মিলিতভাবে এর মোকাবিলা করতে হবে।এখন সময় এসেছে বিশ্বের উপলব্ধি করার যে, জলবায়ু ন্যায্যতা কোনো দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। বিশ্বের এক প্রান্তে সৃষ্ট নিঃসরণ যদি অন্য প্রান্তের মানুষের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে, তাহলে জলবায়ু মোকাবিলার পদক্ষেপ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সংহতিকেও সীমান্ত অতিক্রম করতে হবে।নেপালের বন্যাকে একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে দেখা উচিত সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে: পরিবর্তিত জলবায়ু থেকে কোনো দেশ একা রক্ষা পেতে পারে না, এবং এর পরিণতি মোকাবিলায় কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

১ মাস আগে

জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি


জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পরিচিত দৃশ্য - ভয়াবহ দাবানল, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা খরায় ফেটে যাওয়া মাটি। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এসব দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি স্থান পায়। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো জলবায়ু সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ। যেমনি হিমশৈলের (Iceberg) সবচেয়ে বড় এবং গভীর অংশ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে তেমনি জলবায়ূ পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ও ক্ষত মিশে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে যা উপর থেকে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ফসলহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে গিয়ে এর অন্তর্নিহিত কারণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।দৃশ্যমান দুর্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপবর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে। এসব দুর্যোগ তাৎক্ষণিক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো অনেক বেশি গভীর এবং জটিল যা আমাদের জীবনকে দূর্বীসহ করে তোলে।দুর্যোগের আড়ালে শুরু হয় আরেকটি সংকটপ্রতিটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে। যখন খরায় ফসল নষ্ট হয়, তখন শুধু কৃষকের উৎপাদনই কমে না; খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হয়। কৃষক তার আয়ের উৎস হারান, পরিবারগুলো ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় এবং অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।একইভাবে নদী, খাল ও জলাধার শুকিয়ে গেলে শুধু পানির সংকটই সৃষ্টি হয় না; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করে।খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর কিন্তু কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা ও খরার কারণে কৃষি উৎপাদন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।ফসলের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কম এবং নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে। ক্ষুধা তখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকিজলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যার কারণে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি।অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈষম্যের বিস্তারজলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তারা সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতাজলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সীমিত ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে।বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে। Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC) -এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪–২০২৩) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে যা বিভিন্ন দেশে অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।জলবায়ু সংকট: উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যাহত হয়। স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরী। দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই সর্বোত্তম সমাধানজলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা, বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা দুর্যোগ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনইজলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ করে। তাই শুধু বন্যা, খরা কিংবা দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই চলবে না। আমাদের দেখতে হবে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। এই সামগ্রিক চিত্রটি উপলব্ধি করলেই আমরা এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। উপসংহার: সংকটের আড়ালে গভীর সংকটজলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। অতএব, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা কেবল লক্ষণ নয়, সংকটের মূল কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।লেখক: নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রীল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.com

১ মাস আগে

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ : তারেক রহমান

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ : তারেক রহমান

২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকাল ০৩:১৬:৪৭

শিরোনাম
নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হয়রানি, তীব্র নিন্দা সরকারের ঘুমন্ত ভগ্নিপতিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, শ্যালক গ্রেপ্তার চাটমোহরে জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবি পাবিপ্রবিতে সকল শিক্ষককে নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত পাবনায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত অটোরিকশার গ্যারেজে ইয়াবা ও আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেপ্তার ৩ নোয়াখালীতে হাসপাতালের জানালার গ্রিল কেটে ৯ লাখ টাকা চুরি ইউনূসসহ অন্তবর্তী সরকারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি নাহিদের হামের উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ, আটক একাধিক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপন সেনবাগে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত সাফের আগে বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম ৩ দিন বন্ধ থাকবে ১০ গবেষককে গবেষণা বৃত্তি দেবে বাংলা একাডেমি আজ বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস শাহরুখের ‘কিং’ সিনেমায় মেয়ে সুহানা খানের বিশেষ গান হাড়কে সুস্থ রাখবে যেসব খাবার নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার ড. ইউনূস নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে হয়রানি, তীব্র নিন্দা সরকারের ঘুমন্ত ভগ্নিপতিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, শ্যালক গ্রেপ্তার চাটমোহরে জমি দখল চেষ্টার অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবি পাবিপ্রবিতে সকল শিক্ষককে নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত পাবনায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত অটোরিকশার গ্যারেজে ইয়াবা ও আগ্নেয়াস্ত্র, গ্রেপ্তার ৩ নোয়াখালীতে হাসপাতালের জানালার গ্রিল কেটে ৯ লাখ টাকা চুরি ইউনূসসহ অন্তবর্তী সরকারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি নাহিদের হামের উপসর্গে আরও ৬ মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভ, আটক একাধিক রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্থাপন সেনবাগে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত সাফের আগে বড় ধাক্কা খেল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম ৩ দিন বন্ধ থাকবে ১০ গবেষককে গবেষণা বৃত্তি দেবে বাংলা একাডেমি আজ বিশ্ব ব্যর্থতা দিবস শাহরুখের ‘কিং’ সিনেমায় মেয়ে সুহানা খানের বিশেষ গান হাড়কে সুস্থ রাখবে যেসব খাবার নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার ড. ইউনূস